আজ স্কুলে বেরোবার ঠিক আগে আকাশবাণীর কলকাতা প্রচার তরঙ্গে ‘গানের ভেলা’ অনুষ্ঠানে বেজে উঠল, ‘নিবিড় অমা- তিমির হতে বাহির হল জোয়ার- স্রোতে/ শুক্লরাতে চাঁদের তরণী…। গায়ক শ্রী অর্ঘ্য সেন।

দাঁড়িয়ে গেলাম। বাইরে বিজয়ের তাড়া লাগানো হর্ন। দেরী করে বেরোলে স্কুলে প্রেয়ার শুরু হয়ে যাবে যে!

‘তিথির পরে তিথির ঘাটে আসিছে তরী দোলের নাটে…’ গাইছেন অর্ঘ্য সেন।

যতক্ষণ না উৎসবের পসরা নিয়ে চাঁদের তরণী পূর্ণিমার কূলেতে ভিড়লো, আমি দাঁড়িয়ে শুনলাম।

আবার অধৈর্য হর্ন।

এবার ছুটে গাড়িতে। মৌসুমী দি একটু যেন চিন্তিত। ঘড়ি দেখছে বার বার।

সারা রাস্তা নীরব- হাসির অর্ঘ্য সেনকে দেখতে দেখতে গেলাম। কখন যেন ঢুকে পড়লাম অরবিন্দ ভবনে।

কোর্ট কম্পাউন্ডের আগে লেকটার গায়ে অরবিন্দ ভবন। প্রায় প্রত্যেক মাসেই শিল্পীর অনুষ্ঠান থাকত।

খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষটি হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে গেয়ে উঠতেন, ‘আমার এ ঘরে আপনার করে গৃহদীপখানি জ্বালো’।

ভবনের বিশাল ঘরের বাইরে পাখিরা ফিরতো সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছ গুলোর বাসায়। তাদের কত ডাকাডাকি! খোলা জানলাগুলোর ফাঁক দিয়ে সব দেখা যেত।

সন্ধ্যা নেমে আসত।

ব্যাকব্রাশ করা চুল আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমার পেছনে আধ- বোজা চোখে মগ্ন শিল্পী গাইতেন, ‘গৃহদীপখানি জ্বালো’।

যখন গেয়ে উঠতেন, ‘তোমারি পুণ্য আলোকে বসিয়া সবারে বাসিব ভালো…’ ভবনে, লেকে, কোর্ট কম্পাউন্ডে, একটু দূরে টাউন স্কুলে, রাস্তায় আলোগুলো সব জ্বলে উঠতো। শুদ্ধ মা আর কোমল নির মেলবন্ধনে দেশ রাগের সর্বব্যাপ্ত ভালোবাসা চারিদিকে আলো হয়ে যেন ছড়িয়ে পড়ত।

‘জানি গো, দিন যাবে এ দিন যাবে’। অর্ঘ্য সেন গান শেষ করতেন।

রাত ঠিক আটটা। স্মিত হাস্যে একটু দৌড়ে সাইড- ব্যাগটা কাঁধে রাখতে রাখতে গেটের বাইরে অপেক্ষারত ambassador গাড়িতে উঠে পড়তেন শিল্পী। সোয়া- আটটায় যে ট্রেন!

‘শেষ বিদায়ের চাওয়া আমার মুখের পানে চাবে’। ঘরের ভেতর থেকে বেজে উঠতো। কে যেন tape- recorder এ নির্জন অর্ঘ্য – কন্ঠ বন্দী করেছে।

কয়েক বছর আগে ইউ টিউব চ্যানেলে দেখলাম অর্ঘ্য সেন ঘরোয়া ক্লাস নিচ্ছেন। তলায় বেশ কিছু মন্তব্য।

কলেজে যে গানটা গাইতে, সেটা একদিন শুনিয়ো। এক বৃদ্ধার আকুল অনুরোধ।

অনুরোধ চিরকুমার অর্ঘ্য রেখেছিলেন কিনা জানা নেই।

তবে নির্জনতায় ঘেরা অর্ঘ্যর কন্ঠে কেমন এক তাঁর গুরু দেবব্রতীয় অন্তরলীন উদাসীনতার ছোঁয়া পাচ্ছিলাম যখন শুনছিলাম,’আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি তোমায় দেখতে আমি পাই নি’। বিরাজদার নতুন কেনা গাড়ির দামি সাউন্ড-সিস্টেমে গানটা কেমন কেটে যাওয়া দূর আকাশের সাদা ঘুড়ির মত মন খারাপ করে দিল।

বর্ধমানে ঘুড়ির মেলা কাল শেষ হল।

আর হ্যাঁ, স্কুলে প্রেয়ারের বেশ আগেই আজ পৌঁছতে পেরেছিলাম।

উৎসবের পসরায় যে মোড়া ছিল আজকের যাত্রা!

Leave a Reply