গত সপ্তাহে ঘাটশিলা গেছিলাম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রীহীন হয়ে থাকা বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়লো একটি গাছের মোটা গুঁড়ি। নিচে লেখা ভাই নুটবাবু দাদা বিভূতিভূষণের জন্য এই আমগাছটি রোপণ করেছিলেন।
নুটবিহারীর জন্য দাদা বিভূতিভূষণের চিন্তার শেষ ছিল না। অনেক কৃচ্ছসাধন করে ভাইকে ডাক্তারি পড়িয়েছিলেন। দাদার মৃত্যুর পর মানসিক অবসাদে চলে যান নুটবিহারী।
বিভূতিভূষণ অসুস্থ হন ধলভূমগড়ের জমিদার বাড়িতে এক টি – পার্টিতে। দিন তিনেক শুয়ে থাকার পর ১৯৫০ এর ১ লা নভেম্বর রাত আটটার আশেপাশে মারা যান।
নুটবিহারী পিতৃসম দাদার শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ করতেন কাছাধারণ করেই।
হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ফিরে এলেন। ‘ যমুনা, আমার আর দাদার কাজ করা হল না। একটু আগে দেখলাম মোড়ের মাথায় এক গাছের নিচে দাদা আমার দিকে তাকিয়ে ডাকছেন, আয়, আয়, আয়।’ স্ত্রীকে বললেন নুটবিহারী, মেঝেতে শুয়ে পড়ে।
এক আদিবাসী ছেলে দৌড়ে এসে কয়েকদিন পর খবর দেয় নুটবিহারী নদীর ধারে পড়ে আছেন।
বাড়ির সবাই দৌড়ে গিয়ে দেখে সুবর্ণরেখার পাড়ে ছটফট করছেন নুটবাবু। পাশে কার্বলিক আসিডের খালি বোতল।
দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় হসপিটালে। স্টমাক পাম্প করা হয়। বাঁচান যায় নি নুটবাবুকে। ভেতরটা ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
বিভূতিভূষণের স্ত্রী একটা চিঠি পান ঘাটশিলার ওসির কাছ থেকে কয়েকমাস পরে। চিঠিতে ওসি লেখেন তিনি বিভূতিভূষণের মৃত্যুর কয়েক দিন আগে এক চিঠি পান পাকুড় থেকে। তাতে তাঁকে অনুরোধ করা ছিল তিনি যেন বিভূতিভূষণের পরিবারের সবাইকে ঘাটশিলা থেকে কলকাতায় সরিয়ে দেন। কারণ ওখানে থাকলে বিভূতিভূষণ – পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ওসি বাইরে থাকায় সে ব্যবস্থা তিনি নিতে পারেন নি। পরে পত্রপ্রেরকের খোঁজ করেন পাকুড়ের ঠিকানায়। ওই নামে তিনি কাউকে পান নি।
কার্বলিক আসিডের খালি বোতলটি প্যাঁচ দিয়ে আঁটা অবস্থায় পুলিশ পেয়েছিল। পুরো অ্যাসিডটা খেয়ে প্যাঁচ দিয়ে শক্ত করে ছিপি আঁটার কোন সময় পাওয়া যায় কি? পুলিশের কাছে এ প্রশ্ন ছিল অধরা।
দাদা বিভূতিভূষণ মারা যাবার ঠিক এক সপ্তাহ পর ১৯৫০ এর ৮ ই নভেম্বর ভাই নুটবিহারী মারা যান।
আম – গুঁড়িটার কাছে গিয়ে দেখি নতুন কচি ডালপালাগুলো মৃদুমন্দ বাতাসে কাঁপছে।